Home » News » এক-আইডি: এনআইডি ও জন্মনিবন্ধন বাদ দিয়ে বাংলাদেশে আসছে নতুন ডিজিটাল পরিচয়পত্র

এক-আইডি: এনআইডি ও জন্মনিবন্ধন বাদ দিয়ে বাংলাদেশে আসছে নতুন ডিজিটাল পরিচয়পত্র

বাংলাদেশের এক-আইডি ডিজিটাল পরিচয়পত্রের ধারণা

দেশের নাগরিকদের জন্য পরিচয় প্রমাণের ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও জন্মনিবন্ধন সনদের বদলে এক-আইডি নামে একটি একক ও স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জন্মের পর থেকেই একজন নাগরিক আজীবনের জন্য এই পরিচয় পাবেন এবং তা দিয়েই স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পাসপোর্ট, ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা নেওয়া যাবে।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব মামুনুর রশীদ ভূঞা সম্প্রতি এই উদ্যোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নিচে এক-আইডি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলো।

এক-আইডি আসলে কী?

এক-আইডির পূর্ণ নাম ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেন্টিটি (Unified Digital Identity)। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে একজন নাগরিকের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব তথ্য একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত থাকবে। এই ধারণাকে সংক্ষেপে বলা হচ্ছে— “এক নাগরিক, এক ডিজিটাল পরিচয়, একটি ওয়ালেট”

বর্তমানে দেশে জন্মের পর একটি শিশুকে জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া হয়। এরপর ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হলে দেওয়া হয় জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি। নতুন ব্যবস্থায় বয়সভিত্তিক আলাদা পরিচয়পত্রের প্রয়োজন থাকবে না— জন্মের পরপরই একজন নাগরিক পাবেন একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয়, যা সারা জীবন ব্যবহারযোগ্য হবে।

কেন এই উদ্যোগ?

বর্তমানে একজন নাগরিককে জীবনের বিভিন্ন ধাপে আলাদা আলাদাভাবে জন্মনিবন্ধন সনদ, এনআইডি, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও কর শনাক্তকরণ নম্বরের (টিআইএন) মতো একাধিক পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে হয়। প্রতিটি সেবার জন্য বারবার একই তথ্য জমা দিতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ভোগান্তির কারণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান তথ্যভান্ডারগুলোর মধ্যে কার্যকর আন্তসংযোগ তৈরি করা গেলে—

  • নাগরিকদের একই তথ্য বারবার দিতে হবে না
  • সরকারি সেবা পেতে সময় ও ভোগান্তি কমবে
  • সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সহজ হবে
  • জাল পরিচয়পত্র ও দুর্নীতি রোধ করা সহজ হবে

বাস্তবায়ন করবে কোন প্রতিষ্ঠান? ডি-স্টার প্রকল্প পরিচিতি

এক-আইডি বাস্তবায়নের জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ “ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স” বা সংক্ষেপে ডি-স্টার (D-STAR) নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল

প্রকল্পটি ইতোমধ্যে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে এটি বাস্তবায়িত হবে ধাপে ধাপে।

প্রকল্পের সময়সূচি ও পরিধি এক নজরে

বিষয়তথ্য
প্রকল্পের নামডি-স্টার (Digital Service Transformation for Access and Resilience)
বাস্তবায়নকারী সংস্থাবাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল
তত্ত্বাবধানকারী মন্ত্রণালয়/বিভাগতথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ
বাস্তবায়নকাল (প্রস্তাবিত)২০২৬–২০৩১
লক্ষ্য জনসংখ্যাআনুমানিক ১৮ কোটি নাগরিক
কার্ড উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাপ্রায় ২০ কোটি কার্ড
কার্ডের ধরনপলিকার্বোনেট চিপযুক্ত কার্ড
মোট প্রকল্প ব্যয় (প্রস্তাবিত)প্রায় ৯,১৯৩ কোটি টাকা
সরকারি অর্থায়নপ্রায় ৭,৬৬৩ কোটি টাকা
বৈদেশিক ঋণবিশ্বব্যাংক থেকে প্রায় ১,৫৩০ কোটি টাকা
বর্তমান অবস্থাপরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের অপেক্ষায়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি

উল্লেখ্য: উপরের সব তথ্য প্রকল্প প্রস্তাবনার প্রাথমিক পর্যায়ের হিসাব অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর সংখ্যাগুলোতে পরিবর্তন আসতে পারে।

কার্ড উৎপাদন খরচের হিসাব

প্রতিটি এক-আইডি কার্ড তৈরিতে প্রস্তাবিত ব্যয়ের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে দেওয়া হলো:

খাতআনুমানিক ব্যয় (প্রতি কার্ড)
কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণপ্রায় ২ মার্কিন ডলার (≈ ২৪৬ টাকা)
বিতরণ ও সরবরাহপ্রায়মার্কিন ডলার (≈ ১২৩ টাকা)
মোটপ্রায় ৩৬৯ টাকা

প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত হলো কার্ড উৎপাদন, মুদ্রণ, নাগরিকদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ ও কার্ড বিতরণ— যেখানে মোট প্রায় ৭,৩৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

এক-আইডিতে কোন কোন সেবা যুক্ত হতে পারে

সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী নিচের কার্ড ও সেবাগুলো ধীরে ধীরে এক-আইডির সঙ্গে একীভূত হতে পারে:

  • জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)
  • জন্মনিবন্ধন সনদ
  • ফ্যামিলি কার্ড
  • কৃষক কার্ড
  • পাসপোর্ট সংক্রান্ত তথ্য
  • স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সংক্রান্ত সেবা

তবে খেয়াল রাখা জরুরি— এসব একীভূতকরণের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ বলছে, এক-আইডি চালু হলে ধীরে ধীরে বিদ্যমান কার্ডগুলোর কার্যকারিতা কমে আসবে, তবে এটি একদিনে বাস্তবায়ন হবে না।

ডিজিটাল ওয়ালেট: আর্থিক লেনদেনের জন্য নয়

এক-আইডির সঙ্গে প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ডিজিটাল আইডি ওয়ালেট থাকার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে এনআইডি বা পাসপোর্টের মতো নথিপত্র ডিজিটাল আকারে সংরক্ষিত থাকবে। তবে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এটি বিকাশ বা নগদের মতো কোনো পেমেন্ট ওয়ালেট নয়— বরং এটি মূলত পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।

অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

এক-আইডি তৈরির ক্ষেত্রে সরকার বিশ্বের কয়েকটি দেশের ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে—

  1. যুক্তরাষ্ট্র
  2. সিঙ্গাপুর
  3. এস্তোনিয়া
  4. ভারত (আধার ব্যবস্থা)

এস্তোনিয়া ও ভারতের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে একক ডিজিটাল আইডি ব্যবস্থায় সফলতা দেখিয়েছে, যা বাংলাদেশের এই পরিকল্পনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এখনো যেসব প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত

এক-আইডি নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি, যেমন—

  • নতুন পরিচয়পত্রে ঠিক কী কী তথ্য সংরক্ষণ করা হবে
  • নাগরিকের তথ্য সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে
  • কোন কোন সরকারি সেবা সরাসরি এর সঙ্গে যুক্ত হবে
  • বিদ্যমান এনআইডি ও জন্মনিবন্ধন সনদ সম্পূর্ণ বাতিল হবে, নাকি রূপান্তরিত হবে

এসব বিষয় প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদনের পরই স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সংক্ষেপে এক-আইডি সম্পর্কে যা জানা জরুরি

  • এক-আইডি একটি ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেন্টিটি ব্যবস্থা, যা জন্মের পর থেকেই দেওয়া হবে
  • বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, প্রকল্পের নাম ডি-স্টার
  • প্রস্তাবিত বাস্তবায়নকাল ২০২৬-২০৩১
  • প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯,১৯৩ কোটি টাকা
  • এখনো এটি পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায়, চূড়ান্ত হয়নি
  • এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ একাধিক পরিচয়পত্র একীভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে

উপসংহার

এনআইডি ও জন্মনিবন্ধনের বদলে এক-আইডি চালুর এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের নাগরিক সেবা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে। তবে প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং অনুমোদন, বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও তথ্য সুরক্ষা নিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো বাকি। প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্যের জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের অফিসিয়াল ঘোষণার দিকে নজর রাখা জরুরি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top