ওয়ারিশ সনদ আবেদন করতে হলে মৃত ব্যক্তির স্থায়ী ঠিকানা যে এলাকায়, সেখানকার ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনে যেতে হয়। সেখানে আবেদনপত্র, মৃত্যু সনদ, এনআইডি ও ওয়ারিশদের তথ্য জমা দিলে যাচাই শেষে সনদ দেওয়া হয়।
মৃত্যুর পর সম্পত্তির নামজারি, ব্যাংক হিসাব বা বিমার টাকা তোলা, পেনশন ও সঞ্চয়পত্রের মতো কাজে এই সনদ দরকার হয়। তাই কীভাবে আবেদন করবেন, কী কী কাগজ লাগবে, এই লেখায় সব ধাপে ধাপে পাবেন।
সূচিপত্র
- ওয়ারিশ সনদ কী?
- ওয়ারিশ সনদ কেন প্রয়োজন?
- ওয়ারিশ সনদ কোথা থেকে পাওয়া যায়?
- প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
- ওয়ারিশ সনদ আবেদনের ধাপসমূহ
- অনলাইনে আবেদন করা যায় কি?
- ফি ও সময় কত লাগে?
- ওয়ারিশ সনদ ও সাকসেশন সার্টিফিকেটের পার্থক্য
- সাধারণ ভুল, যা এড়িয়ে চলবেন
- সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
ওয়ারিশ সনদ কী?
ওয়ারিশ সনদ (ওয়ারিশান সনদ বা ওয়ারিশান সার্টিফিকেট) হলো একটি সরকারি প্রত্যয়নপত্র। এতে মৃত ব্যক্তির জীবিত উত্তরাধিকারীদের নাম, বয়স, সম্পর্ক, পেশা ও বৈবাহিক অবস্থা উল্লেখ থাকে।
সনদে কে কত অংশ পাবেন তা সাধারণত নির্ধারিত হয় না। অংশ ঠিক হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত আইন (যেমন মুসলিম উত্তরাধিকার আইন) অনুযায়ী। সনদ শুধু প্রমাণ করে, কারা বৈধ ওয়ারিশ।
ওয়ারিশ সনদ কেন প্রয়োজন?
নিচের কাজগুলোতে সাধারণত এই সনদ চাওয়া হয়:
- জমি বা বাড়ির নামজারি ও খারিজ
- মৃত ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের টাকা উত্তোলন
- সঞ্চয়পত্র, জীবন বীমা ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা পাওয়া
- সরকারি চাকরিজীবীর পেনশন, কল্যাণ ভাতা ও দাফন অনুদান
- বিদেশে মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ বা প্রাপ্য বুঝে নেওয়া
- আদালতে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত মামলায় প্রমাণ হিসেবে
ওয়ারিশ সনদ কোথা থেকে পাওয়া যায়?
মৃত ব্যক্তির স্থায়ী ঠিকানা অনুযায়ী সনদ দেন:
- গ্রামাঞ্চলে: ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান
- পৌর এলাকায়: পৌরসভার মেয়র বা ওয়ার্ড কাউন্সিলর
- সিটি কর্পোরেশনে: মেয়র বা সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর
গুরুত্বপূর্ণ: আবেদনকারীর নয়, মৃত ব্যক্তির স্থায়ী ঠিকানার এলাকা থেকে সনদ নিতে হয়।
ওয়ারিশ সনদের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
এলাকাভেদে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে। সাধারণত যা লাগে:
- হাতে লেখা বা নির্ধারিত ফরমে আবেদনপত্র
- মৃত ব্যক্তির মৃত্যু সনদ (মৃত্যু নিবন্ধন)
- মৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন এর ফটোকপি
- আবেদনকারীর এনআইডির ফটোকপি
- সব ওয়ারিশের নাম, বয়স, সম্পর্ক, পেশা ও বৈবাহিক অবস্থার তালিকা
- ওয়ারিশদের এনআইডি বা জন্ম নিবন্ধনের ফটোকপি
- আবেদনকারী ও মৃত ব্যক্তির পাসপোর্ট সাইজ ছবি
- কিছু এলাকায় হোল্ডিং ট্যাক্সের রসিদ বা স্থানীয় সাক্ষীর প্রত্যয়ন
মৃত্যু সনদ না থাকলে আগে মৃত্যু নিবন্ধন করে নিন। অনলাইনে মৃত্যু নিবন্ধনের আবেদন হয় bdris.gov.bd পোর্টালে। অনলাইনে ফরম পূরণের পর প্রিন্ট কপি ও কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট অফিসে জমা দিতে হয়।
ওয়ারিশ সনদ আবেদনের ধাপসমূহ
ধাপ ১: মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করুন। মৃত্যু সনদ ছাড়া সাধারণত ওয়ারিশ সনদের আবেদন গ্রহণ করা হয় না।
ধাপ ২: ওয়ারিশদের তালিকা তৈরি করুন। স্বামী বা স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, বাবা-মা, প্রয়োজনে অন্যদের নাম, বয়স ও সম্পর্ক সঠিকভাবে লিখুন। একজন ওয়ারিশও বাদ গেলে পরে জটিলতা হতে পারে।
ধাপ ৩: আবেদনপত্র লিখুন। চেয়ারম্যান, মেয়র বা কাউন্সিলরকে উদ্দেশ্য করে আবেদন লিখুন। মৃত ব্যক্তির নাম, পিতার নাম, ঠিকানা ও মৃত্যুর তারিখ উল্লেখ করুন।
ধাপ ৪: কাগজপত্র সংযুক্ত করুন। উপরের তালিকা মিলিয়ে সব ফটোকপি ও ছবি একসাথে করুন।
ধাপ ৫: অফিসে জমা দিন। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট অফিসে জমা দিন এবং রসিদ বা প্রাপ্তিস্বীকার নিন।
ধাপ ৬: যাচাই ও সনদ গ্রহণ। কর্তৃপক্ষ স্থানীয়ভাবে তথ্য যাচাই করে। এরপর নির্ধারিত ফি দিয়ে সনদ সংগ্রহ করুন। সনদে স্বাক্ষর, সিল ও সনদ নম্বর আছে কি না দেখে নিন।
অনলাইনে ওয়ারিশ সনদ আবেদন করা যায় কি?
অনেক ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে অনলাইনে আবেদনের সুবিধা দিচ্ছে। তবে সব এলাকায় এখনো একই ব্যবস্থা চালু নেই।
অনলাইনে আবেদনের সুবিধা না থাকলে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (UDC) থেকে সাহায্য নিতে পারেন। আপনার এলাকার ওয়েবসাইটে ওয়ারিশ সনদের সার্ভিস আছে কি না, আগে অফিসে ফোন করে জেনে নিন।
ওয়ারিশ সনদের ফি ও সময়
- ফি: স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানভেদে ফি আলাদা হয়। আবেদন জমার সময় অফিস থেকে সরকারি ফি জেনে নিন এবং অবশ্যই রসিদ নিন।
- সময়: সাধারণত তথ্য যাচাই শেষে কয়েক কার্যদিবসের মধ্যে সনদ পাওয়া যায়। ওয়ারিশদের সংখ্যা বেশি বা তথ্যে অসংগতি থাকলে বেশি সময় লাগতে পারে।
ওয়ারিশ সনদ বনাম সাকসেশন সার্টিফিকেট
| বিষয় | ওয়ারিশ সনদ | সাকসেশন সার্টিফিকেট |
|---|---|---|
| কে দেন | ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন | জেলা জজ আদালত |
| প্রক্রিয়া | সহজ ও তুলনামূলক দ্রুত | আদালতে আবেদন ও শুনানি লাগে |
| কখন লাগে | নামজারি, ব্যাংক, পেনশনসহ সাধারণ কাজে | বড় অঙ্কের অর্থ, শেয়ার, বিমা বা বিরোধপূর্ণ ক্ষেত্রে |
ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান কখনো কখনো সাকসেশন সার্টিফিকেট চাইতে পারে। আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে জেনে নিলে সময় বাঁচবে।
যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
- মৃত্যু সনদ ছাড়া আবেদন করতে যাওয়া
- কোনো ওয়ারিশের নাম বাদ দেওয়া বা সম্পর্ক ভুল লেখা
- নামের বানান এনআইডি ও মৃত্যু সনদে ভিন্ন থাকা
- ফি দিয়ে রসিদ না নেওয়া
- দালালের মাধ্যমে বাড়তি টাকা দেওয়া
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
মৃত ব্যক্তির স্থায়ী ঠিকানার এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়ে।
আবেদনপত্র, মৃত্যু সনদ, মৃত ব্যক্তি ও আবেদনকারীর এনআইডি, ওয়ারিশদের তালিকা ও ছবি।
সাধারণত না। আগে মৃত্যু নিবন্ধন করে নেওয়া ভালো।
সনদে সাধারণত নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে না। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান সাম্প্রতিক তারিখের সনদ চাইতে পারে।
কিছু এলাকায় অনলাইনে আবেদনের সুযোগ আছে। তবে সব জায়গায় নেই, তাই স্থানীয় অফিসে জেনে নিন।
সংশ্লিষ্ট অফিসে নতুন করে আবেদন করুন বা সনদের অফিস কপির সূত্রে সার্টিফায়েড কপি চান।
শেষ কথা
ওয়ারিশ সনদ আবেদন প্রক্রিয়া সহজ, তবে তথ্যে ভুল থাকলে পরে নামজারি বা ব্যাংকের কাজে আটকে যেতে পারে। তাই মৃত্যু সনদ ও ওয়ারিশদের সঠিক তালিকা আগে গুছিয়ে নিন, তারপর আবেদন করুন।
সর্বশেষ আপডেট: অক্টোবর ২০২৬। ফি ও নিয়ম স্থানীয় অফিসভেদে পরিবর্তন হতে পারে। আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।




